ঢাকা, রবিবার, ৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

আলোচনা-সমঝোতায় দেশ এগিয়ে নিতে দলগুলোর প্রতি রাষ্ট্রপতির আহ্বান

হানাহানি ও সংঘাত এড়িয়ে পারস্পরিক আলোচনা এবং সমঝোতার মাধ্যমে দেশকে এগিয়ে নিতে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে রাজনৈতিক সহনশীলতা ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে সুপ্রতিষ্ঠিত করার ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।


রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) বিকেলে ঠাকুরগাঁও সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে আয়োজিত গুণীজন সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেওয়ার সময় এ আহ্বান জানান রাষ্ট্রপতি।তিনি বলেন, ‘আমার অনুরোধ থাকবে আপনাদের প্রতি, সকল রাজনৈতিক দলগুলোর নেতৃবৃন্দের কাছে যে, কোনো হানাহানি নয়, কোনো সংঘর্ষ নয়, আলাপ-আলোচনার মধ্য দিয়ে রাজনীতি করি আমরা। গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় জিনিস যেটা সেটা হচ্ছে টলারেন্স, সহিষ্ণুতা। সেই সহিষ্ণুতা নিয়ে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। আমাদেরকে গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠানগুলোকে তৈরি করতে হবে। এটা যদি আমরা তৈরি করতে পারি, তাহলে আমরা গণতন্ত্রকে সুপ্রতিষ্ঠিত করতে পারব।


গণতন্ত্রের জন্য দীর্ঘদিনের সংগ্রামের কথা তুলে ধরে মির্জা ফখরুল বলেন, আমরা যে গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম করেছি, লড়াই করেছি, সেই গণতন্ত্রকে আমরা রক্ষা করতে চাই। সেই গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে আমরা তৈরি করতে চাই। আমরা বাংলাদেশে সত্যিকার অর্থেই একটা সমঝোতার রাজনীতি, পলিটিক্স অব রিকনসিলিয়েশন দেখতে চাই। আমরা দেখতে চাই মানুষের অভাব কী করে দূর করা যায় তার চেষ্টা করা। আমরা দেখতে চাই কী করে শিক্ষার উন্নয়ন করা। আমরা দেখতে পাই এই যে আমাদের ছেলেমেয়েরা এখানে আছে, তারা যেন লেখাপড়া শেষ করে চাকরি পায়, ব্যবসা পায়। আমরা দেখতে চাই না যে এখানে হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিস্টানের মধ্যে কোনো বিভেদ সৃষ্টি হোক। আমরা দেখতে চাই যে, এখানে সবাই একসাথে বাংলাদেশি নাগরিক হয়ে তারা এখানে বেঁচে থাকুক তাদের অধিকার নিয়ে। এই বিষয়গুলো আমাদের সবসময় মনে রাখতে হবে।’


ঠাকুরগাঁওয়ের উন্নয়নে নানা উদ্যোগের কথা তুলে ধরলেন

রাষ্ট্রপতি বলেন, ঠাকুরগাঁওয়ের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে পিছিয়ে থাকা ও দরিদ্র এলাকার বাসিন্দা। এ এলাকার মানুষের বিভিন্ন দাবির প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নির্বাচনী প্রচারণায় এসে যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তার মধ্যে ঠাকুরগাঁওয়ে একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিষয়টিও ছিল।


তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য জমি নির্ধারণের কাজ হয়ে গেছে এবং উপাচার্যও সেখানে উপস্থিত রয়েছেন। সোমবার এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হবে। এর ফলে ঠাকুরগাঁওয়ের শিক্ষার্থীরা নিজ এলাকাতেই উচ্চশিক্ষার সুযোগ পাবে।


মির্জা ফখরুল জানান, ঠাকুরগাঁওয়ে মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার দাবিও পূরণ হয়েছে। এর জায়গা নির্ধারণ করা হয়েছে এবং জমির বিষয়টি চূড়ান্ত হওয়ার পর আগামী বছর থেকে সেখানে শিক্ষার্থী ভর্তি শুরু হবে।


তিনি বলেন, ভুল্লী ও রুহিয়াকে পৃথক উপজেলা করার দাবিও বাস্তবায়িত হয়েছে। দুই এলাকাকে পৃথক করে দেওয়া হয়েছে, ইউএনও যোগ দিয়েছেন এবং প্রশাসনিক কার্যক্রম শুরু হয়েছে।


বিমানবন্দর চালু রাখতে বাড়াতে হবে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড

ঠাকুরগাঁওয়ে বিমানবন্দর চাওয়ার প্রসঙ্গে রাষ্ট্রপতি বলেন, বিমানবন্দর হলে সাধারণ মানুষের সরাসরি কতটা উপকার হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।


তবে বিমানবন্দর চালু করে ভবিষ্যতে তা টেকসই রাখতে হলে এলাকায় কলকারখানা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার পাশাপাশি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়ানোর ওপর জোর দেন তিনি।


মির্জা ফখরুল বলেন, ঠাকুরগাঁওয়ে কলকারখানা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠান প্রায় নেই বললেই চলে। ফলে মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগও কম। এ পরিস্থিতি বদলাতে সরকার কাজ করছে।


তিনি জানান, সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর অর্থ উপদেষ্টাকে ঠাকুরগাঁওয়ে নিয়ে এসে এলাকার বিভিন্ন স্থান পরিদর্শন এবং ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনা করা হয়েছে। বাণিজ্যমন্ত্রীও এলাকা ঘুরে দেখেছেন।


তিনি আশা প্রকাশ করেন, খুব শিগগিরই বিনিয়োগকারীদের ঠাকুরগাঁওয়ে আনা সম্ভব হবে। বিশেষ করে কৃষিভিত্তিক শিল্প গড়ে তোলার মাধ্যমে কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।


কৃষিভিত্তিক শিল্পে চীনা বিনিয়োগের আশা

ঠাকুরগাঁওয়ে চীনা রাষ্ট্রদূতের সফরের প্রসঙ্গও তুলে ধরেন রাষ্ট্রপতি। তিনি বলেন, চীনা রাষ্ট্রদূত এই স্টেডিয়ামে প্রায় ছয় হাজার শিশুর মধ্যে স্কুলব্যাগ বিতরণ করেছিলেন।


এ ছাড়া কয়েকদিন আগে ১০ জন শিশু ও পাঁচজন শিক্ষককে চীনে নিয়ে যাওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি। সেখানে তাদের বিভিন্ন স্থান ঘুরিয়ে দেখানো হয়েছে।


মির্জা ফখরুল বলেন, ঠাকুরগাঁওয়ে শিল্পকারখানা গড়ে তুলতে চীন থেকেও বিনিয়োগকারী ও বিশেষজ্ঞরা আসবেন বলে আশা করা হচ্ছে। তারা কৃষিভিত্তিক শিল্প প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা ও পদ্ধতি নিয়ে কাজ করবেন।


তরুণদের স্বাবলম্বী হওয়ার আহ্বান

যুবসমাজের উদ্দেশে রাষ্ট্রপতি বলেন, তরুণদের নিজেদের পায়ে দাঁড়াতে হবে এবং শুধু চাকরি বা ঠিকাদারির পেছনে ছোটা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। একই সঙ্গে মাদকের বিরুদ্ধে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি।


তিনি বলেন, এমন একটি সমাজ গড়ে তুলতে হবে যেখানে মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসা থাকবে। প্রয়োজনে জীবনের বিনিময়েও দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও গণতন্ত্রের পক্ষে কাজ করার প্রত্যয় থাকতে হবে।


প্রথমবার নিজ জেলায় রাষ্ট্রপতি

রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার পর প্রথমবারের মতো নিজ জেলা ঠাকুরগাঁওয়ে সফরে যান মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। পূর্বনির্ধারিত সূচি অনুযায়ী বেলা ১১টা ৪০ মিনিটে ঠাকুরগাঁও মোহাম্মদ আলী স্টেডিয়ামের হেলিপ্যাডে অবতরণের কথা থাকলেও তিনি সেখানে পৌঁছান দুপুর ১টার দিকে।


পরে ঠাকুরগাঁও জেলা সার্কিট হাউজে তাকে গার্ড অব অনার দেওয়া হয়। সেখান থেকে তিনি সেনুয়া কবরস্থানে গিয়ে বাবা-মায়ের কবর জিয়ারত করেন। পথে সড়কের দুই পাশে সারিবদ্ধ হয়ে থাকা সাধারণ মানুষের শুভেচ্ছার জবাব দেন হাত নেড়ে।


বিকেলে ঐতিহাসিক বড় মাঠে রাষ্ট্রপতির সম্মানে বর্ণাঢ্য নাগরিক সংবর্ধনার আয়োজন করা হয়। জেলার সর্বস্তরের মানুষের পক্ষ থেকে তাকে এ সংবর্ধনা দেওয়া হয়।


সংবর্ধনা শুরুর আগে হঠাৎ পুরো শহর বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়ে এবং শুরু হয় মুষলধারে বৃষ্টি। তবে প্রতিকূল আবহাওয়াও রাষ্ট্রপতিকে ঘিরে মানুষের উচ্ছ্বাসে ভাটা ফেলতে পারেনি।


রাষ্ট্রপতির সফর ঘিরে পুরো ঠাকুরগাঁওয়ে তৈরি হয়েছে উৎসবমুখর পরিবেশ। তাকে স্বাগত জানাতে শহরের প্রধান সড়ক, গুরুত্বপূর্ণ মোড় ও প্রবেশপথগুলো ব্যানার, ফেস্টুন, তোরণ ও আলোকসজ্জায় সাজানো হয়েছে।


সফরের দ্বিতীয় দিন সোমবার ঠাকুরগাঁও বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করার কথা রয়েছে রাষ্ট্রপতির।


এদিকে তার সফর উপলক্ষে পুরো জেলায় জোরদার করা হয়েছে নিরাপত্তা ব্যবস্থা। গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, সড়ক ও অনুষ্ঠানস্থলে বিশেষ নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। রাষ্ট্রপতির যাতায়াতের পুরো পথে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিপুলসংখ্যক সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।


একসময় ঠাকুরগাঁওয়ের সাধারণ মানুষের ঘনিষ্ঠ ‘ঘরের ছেলে’ হিসেবে পরিচিত মির্জা ফখরুলকে এখন রাষ্ট্রপতির আসনে দেখে গর্বিত জেলার মানুষ। প্রিয় নেতা ও দেশের নতুন রাষ্ট্রপতিকে কাছ থেকে একনজর দেখতে এবং তাকে স্বাগত জানাতে জেলার সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখা গেছে।


ads
ads
ads

Our Facebook Page